নববর্ষে ডঃ মোহম্মদ ইউনুসের বানী - ২০১০ সাল হোক দিনবদলের বছর
আরেকটি নতুন বছর এল। নতুন বছরের সঙ্গে নতুন আশা জাগে। এবার বোধহয় ভিন্ন হবে। এবার বোধহয় আমরা জেগে উঠব। এবার বোধহয় আমাদের বোধোদয় হবে। পৃথিবী পাল্টাচ্ছে আর পাল্টাচ্ছে। পাল্টানোর গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। অবিশ্বাস্য গতিতে সবকিছু পাল্টে যাচ্ছে। চারদিকে অসম্ভব সম্ভব হয়ে যাচ্ছে। আর আমরা সম্ভবকে অসম্ভব করে রেখে দিয়ে চলেছি। সবাই বুঝি। সবাই দেখি। সবাই চাই। কিন্তু হয়ে উঠছে না।
এবার চমত্কার নির্বাচন হয়েছে। বিজয়ী দল ও তার সহযোগীরা মহাবিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করেছে। তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। তারা দিনবদলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দিনবদল হোক—এটা দেশের সবাই চাই। দ্রুত হোক, এটাও চাই।
আমাদের তরুণ-তরুণীদের গতি আরবি ঘোড়ার গতি
সর্বপ্রথমে চাই, আমাদের তরুণ-তরুণীরা মুক্ত হোক। তারা বন্ধনহীন হোক। তারা মুক্ত হলেই শুধু দেশের ভবিষ্যত্ সৃষ্টি হবে। তাদের সামনে থেকে সব বাধা সরিয়ে দিতে হবে। তাদের জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তাদের সঙ্গে আমাদের সময়কার মানুষদের অনেক ফারাক। তারা একবিংশ শতাব্দীর প্রজন্ম, এটা মনে রেখে সব আয়োজন সমাধা করতে হবে। তাদের গতি আরবি ঘোড়ার গতি। তাদের বিশ্বের মাপে গড়ে উঠতে হবে। তারাও তা-ই চায়। সে সুযোগ দিলেই তারা বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনের কাতারের একটা দেশ হিসেবে দাঁড় করাতে পারবে।
আমাদের তরুণদের পৃথিবীর অন্য দেশের তরুণদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারার মতো করে তৈরি করতে হবে। তাদের বুদ্ধিতে, নৈপুণ্যে, বিশ্বচেতনায় এবং সর্বোপরি সৃজনশীলতার প্রতিযোগিতায় অন্য দেশের তরুণ-তরুণীদের থেকে এগিয়ে থাকতে হবে। আশপাশের অনেক দেশ, যারা এই কিছুদিন আগেও পিছিয়ে থাকা দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল, তারা এখন অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হতে চলেছে। শুধু তা-ই নয়, তাদের তরুণ-তরুণীদের প্রস্তুতিকে তারা বৈশ্বিক পরিমাপে নিয়ে গেছে। তাদের শিক্ষা আর উন্নত দেশের শিক্ষার সঙ্গে পার্থক্য রাখেনি। ডানে-বামে তাকালেই তাদের প্রতিদিন দেখি। বহুদিন ধরে দেখছি, কীভাবে, কী লক্ষ্যে তারা এগোচ্ছে। এখন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তাদের তরুণ-তরুণীদের দেখলে অবাক লাগে। তাদের কথা শুনলে অবাক লাগে। কী প্রচণ্ড বেগে এগোচ্ছে চীন আর ভারতের তরুণ-তরুণীরা। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া অনেক আগেই গতির সৃষ্টি করেছে তরুণদের মধ্যে। আমাদের সমাজপতি, বুদ্ধিপতিদের প্রতি আকুল আহ্বান, দয়া করে আমাদের তরুণ-তরুণীদের তাদের সৃজনশীলতা ও উদ্যম নিয়ে এসব দেশের তরুণদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে দিন। অন্য দেশের নতুন প্রজন্মের অধীনে ক্ষুদ্র চাকরি করে বেঁচে থাকার ভবিষ্যত্ থেকে তাদের রেহাই দিন। আমরা কোনো প্রতিবন্ধী জাতি নই। আমাদের তরুণ-তরুণীরা অন্য কোনো দেশের তরুণ-তরুণী থেকে কোনো দিক থেকে যোগ্যতায় খাটো নয়। সমকক্ষ তো বটেই, বরং বলব, কোনো কোনো দিক থেকে তাদের পরিমণ্ডল তাদের জন্য বাড়তি সুবিধা দিয়ে রেখেছে। তাহলে তারা পিছিয়ে থাকবে কেন? তাদের একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে দিন। দয়া করে ক্ষুদ্র স্বার্থে তাদের পথ রোধ করে রাখবেন না। তাহলে জাতির পথও রুদ্ধ হয়ে যাবে। আমরা তলিয়ে যাব। তাদের বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার পীঠভূমি হওয়ার সুযোগ দিন। বিদ্যাপীঠগুলোতে থাকার সময় তাদের রাজনৈতিক রেকর্ডের ওপর যদি তাদের ভবিষ্যত্ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের চরম মূল্য দিতে হবে। আমাদের চোখের সামনে এককালে আমাদেরই সহযাত্রী মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যেও তাদের তরুণদের পথকে রুদ্ধ হতে দেয়নি। তাই অনায়াসে তারা আমাদের ছাড়িয়ে গেছে। সবাই আমাদের ছাড়িয়ে যাবে, যদি আমরা তাদের যেতে দিই; আমরা নিজেরা যদি সামনে যাওয়ার এবং তাদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার কোনো উদ্যোগ-আয়োজন না করি। নতুন বছরে আমাদের তরুণ-তরুণীদের জন্য দিনবদলের শপথ সার্থক হোক।
সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিজস্ব শক্তি ও শৃঙ্খলা সৃষ্টি হোক
২০১০ সালে সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন যেন বিনা বাধায় নিজ নিজ সুশাসনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। যে জাতি তার সামাজিক সংগঠনগুলোকে তার নিজস্ব কার্যক্রম সুস্বাস্থ্য ও সুশাসনে প্রতিষ্ঠিত হতে দেয় না, সে জাতি সামনে এগোনোর শক্তি সৃষ্টি করতে পারে না। অর্থনৈতিক নিয়মেও যেসব সর্বনিম্ন আয়ের দেশে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুস্বাস্থ্য আসে না, সেসব দেশ সর্বনিম্ন আয়ের দেশগুলোর তালিকায় স্থায়ী হয়ে থেকে যায়—মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার সুযোগ আর তাদের ভাগ্যে জোটে না।
শুধু আইন করে দিলেই সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না, প্রতিটি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ দিতে হবে; সহমর্মিতা দিয়ে তাকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিতে হবে। জাতির মূল শক্তিই হলো সব পর্যায়ে তার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সাংগঠনিক আয়োজন। এগুলো রাজনৈতিক সংঘর্ষের ও বিদ্বেষের মুখ্য প্রকাশক্ষেত্র হয়ে গেলে জাতিকে রক্ষা করার উপায় থাকবে না।
ছোট্ট পৌরসভার মধ্যেও স্বপ্ন ছিল
আমাদের দেশেও একসময় সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলা ছিল। উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম-শৃঙ্খলার কাঠামোতে শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ পরিবেশ বজায় রেখে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারত। মফস্বলের একটা ছোট্ট পৌরসভার মধ্যেও স্বপ্ন ছিল, কর্মকাণ্ড ছিল, গৌরববোধ ছিল, নিজস্ব কঠোর শৃঙ্খলা ছিল। আমাদের বহুদিনের পুরোনো অতীতকেই এখন স্বপ্নের ভবিষ্যত্ হিসেবে চিন্তা করতে ইচ্ছা করে—এতই হতভাগ্য জাতি আমরা।
আমাদের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো দিন দিন ধসে যাচ্ছে। অথচ এখন আমাদের সামনে রয়েছে উন্নত, নব উন্নত, দ্রুত উন্নয়নমুখী বিশ্বের অনেক দেশের সম্মিলিত আদর্শ ও অভিজ্ঞতার অফুরন্ত জ্বলজ্বলে ছবি। ওদের মতো হওয়ার যোগ্যতা আমাদের নেই, এমন কোনো অদ্ভুত জাতি আমরা নই। এ রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য যে বহু আয়োজন লাগে, তা-ও নয়। দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থ ও আমলাতান্ত্রিক দড়ির বন্ধনগুলো থেকে মুক্তি দিলেই আমাদের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব প্রাণ ফিরে পেতে আরম্ভ করবে; স্থানীয় সরকার প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় সরকার হতে আরম্ভ করবে। জাতি হিসেবে এটা কি আমরা করতে চাই না? আমাদের যোগ্যতার অভাবে এটা হচ্ছে না, নাকি আমাদের ইচ্ছার অভাবে এটা হচ্ছে না?
অন্য যুগে অন্য আরেক পরিস্থিতিতে, আরেক সংকটময় মুহূর্তে আমাদের জাতীয় কবি নজরুল লিখেছিলেন:
‘আজি পরীক্ষা জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ’
আমাদের সামনে অগ্নিপরীক্ষা। নতুন বছর ২০১০ সাল আমাদের এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করে দিক, পরিষ্কার জবাব আসুক—জাতের স্বার্থে চলব, নাকি জাতির স্বার্থে।
দেশের জন্য ২০১০ সাল শুভ হোক—এই কামনা করছি।
মুহাম্মদ ইউনূস, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
সূত্রঃ http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-01-01/news/31759
- Forums:
JUST VIEWED
Last viewed:
- ইন্টারনেটের ফাঁদে চলছে প্রতারণা, বিকৃতি
- চট্টগ্রামে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে পুলিশসহ গ্রেপ্তার ৭
- ‘বেগম জিয়ার ‘চুরির শাসনামলে’ কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে তারেকের বিরুদ্ধে: লন্ডন ইকনোমিস্টের মন্তব্য
- Bangladesh to get $100 mln loan for clean energy
- নিউইয়র্কে মদিনা মসজিদে চুরির সময় হাতেনাতে গ্রেফতার হলো বাংলাদেশী রাহেল হাকিম
- প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা ঢাকা কলেজের শিক্ষকদের
- ছাত্রলীগের হামলায় ছাত্রমৈত্রীর নেতা খুন
- Mujib's killers must hang: SC
- শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা গাড়ি ভাঙচুর করেছে
- দ্যা ডে আফটার
- History of Bangladesh
- যাত্রা হল শুরু
- শেখ হাসিনার খাবারে বিষ মেশানো হয়েছিল
- Dhaka train accident caught on tape...
- Tell a Friend
Latest Blogs
- চক চক করলেই সোনা হয়না...
- 'মহামান্য' আদালতের কেনিয়ান ম্যারাথন...
- একটি রাস্তার ইতিকথা
- ৯/১১ এবং ফ্লোরিডার গেইনসভিল চার্চ
- জন্ম যেখানে আজন্ম পাপ...
- মিথ্যা কি আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা?
- অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ
- রাজনীতির ইফতার বনাম ইফতার রাজনীতি।
- ৩-ডি বাংলাদেশের ইতিবৃত্ত...
- ভারতের সাথে ৭ হাজার কোটির চুক্তি, চাঁদের অন্য পীঠ।
Recent Comments
- কুকুরের কামড়ে নাসিমের
1 week 2 days ago - একজন শাহাদাব আকবরের কথা মনে আছে?
1 week 2 days ago - খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তারেকের তত্ত্বাবধানে গ্রেনেড হামলা হ
1 week 6 days ago - আমরাও পারি, কি বলেন?
2 weeks 5 hours ago - সরকারি পুকুর ভরাট করতে বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার!
2 weeks 1 day ago - খালেদার ইফতার পার্টিতে যাননি আ. লীগ নেতারা
2 weeks 2 days ago - শার্শায় ওসিকে পেটালেন সরকারি দলের এমপি ‘আজ জানে মারলাম না’
2 weeks 4 days ago - রংপুর মেডিকেলে শোক দিবসের অনুষ্ঠানে বিএমএ দুগ্র“পের হাতাহাতি
2 weeks 4 days ago - ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় শেখ হাসিনা অসন্তুষ্ট’
2 weeks 4 days ago - সূত্র
2 weeks 4 days ago





Post new comment